সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা জোট: কী আছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে’?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৮ আগস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’।
চুক্তিতে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির মূল বিষয় কী?
সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্কের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণ ও উন্নত করার বিষয়েও তিন দেশ সম্মত হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইসলামী সংহতির ভিত্তির ওপর এ চুক্তি গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে।
কেন এখন এই চুক্তি?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। ২০২৩ সালে গাজ্জায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিন দেশের মধ্যে আলোচনা আরও গুরুত্ব পায়।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ উদ্যোগ নতুন গতি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রচলিত কাঠামোর ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তিন দেশের সক্ষমতার সমন্বয়
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানিকারক এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। অন্যদিকে পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, এটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়; বরং তিন দেশের মধ্যে কৌশলগত, সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো।
ইরান ও ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া
চুক্তি স্বাক্ষরের পর এখন পর্যন্ত ইরানের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের এক সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর বা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অঞ্চলটির অন্যান্য দেশও এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তিন দেশের অবস্থান
গাজ্জায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান নিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে।
অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান গাজ্জা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের নিয়মিত সমালোচনা করেছেন। পাকিস্তানও গাজ্জায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত?
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তিন দেশ যদি সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্প, জ্বালানি ও কৌশলগত পরিকল্পনায় সমন্বয় বাড়াতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ, সামরিক সহযোগিতার পরিধি এবং কোনো দেশের ওপর হামলা হলে তিন দেশ কী ধরনের যৌথ পদক্ষেপ নেবে—এসব বিষয়ই আগামী দিনে এর কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
সূত্র: আল জাজিরা