উপমহাদেশের ইতিহাসে মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত হলেও তার আইনজীবী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে গাজী ইলমুদ্দীনের মামলার সঙ্গে। ১৯২৯ সালে ‘রঙ্গিলা রাসূল’ পুস্তিকার প্রকাশক মহাশে রাজপালকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ইলমুদ্দীনের পক্ষে লাহোর হাইকোর্টে আপিল পরিচালনা করেন জিন্নাহ।
‘রঙ্গিলা রাসূল’কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
ঘটনার সূত্রপাত ‘রঙ্গিলা রাসূল’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। বইটিতে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগে সে সময় মুসলিম সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

পুস্তিকাটির প্রকাশক ছিলেন লাহোরের মহাশে রাজপাল। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তৎকালীন আইনি কাঠামোর কারণে মামলাটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত শাস্তিতে গড়ায়নি।
এরপর ১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল লাহোরে রাজপালকে হত্যা করেন তরুণ ইলমুদ্দীন। ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জিন্নাহর আপিল
বিচার শেষে ১৯২৯ সালের ২২ মে লাহোরের সেশন আদালত ইলমুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে লাহোর হাইকোর্টে আপিল করা হলে ইলমুদ্দীনের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দাঁড়ান মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ।
হাইকোর্টে জিন্নাহ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও প্রমাণের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাক্ষীদের বক্তব্যের অসঙ্গতি, আসামিকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া এবং মামলার প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
জিন্নাহর আইনি কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে শাস্তি লঘু করার আবেদন। তিনি আদালতের সামনে ইলমুদ্দীনের বয়স এবং ঘটনার পেছনে থাকা ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিও তুলে ধরেন।
বহাল থাকে মৃত্যুদণ্ড
তবে জিন্নাহর আইনি প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯২৯ সালের ১৭ জুলাই লাহোর হাইকোর্ট ইলমুদ্দীনের আপিল খারিজ করে সেশন আদালতের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।
পরবর্তীতে ৩১ অক্টোবর ১৯২৯ মিয়ানওয়ালী কারাগারে ইলমুদ্দীনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর পর মুসলিম সমাজে তিনি ‘গাজী ইলমুদ্দীন শহীদ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
তার মরদেহ লাহোরে ফিরিয়ে এনে দাফনের দাবিও সে সময় মুসলিম সমাজে জোরালো হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে মুসলিম নেতাদের উদ্যোগে তার মরদেহ লাহোরে এনে দাফন করা হয়।
ইতিহাসে জিন্নাহর ভূমিকা
গাজী ইলমুদ্দীনের মামলায় জিন্নাহর ভূমিকা মূলত একজন আইনজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক আদালতে তিনি ইলমুদ্দীনের পক্ষে আপিল পরিচালনা করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষের প্রমাণ ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে একাধিক আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
ইলমুদ্দীনের মামলার এই অধ্যায় জিন্নাহর আইনজীবী জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আসছে।
সূত্র: লাহোর হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়, ১৯২৯।