আফগানিস্তান—দুর্গম পাহাড়, বিস্তীর্ণ উপত্যকা ও দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসে গড়ে ওঠা এক ভূখণ্ড। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি দেশটির ওপর নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি ও বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আফগানিস্তানের জনগণের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মুখে একাধিক পরাশক্তিকে শেষ পর্যন্ত সরে যেতে হয়েছে।
আধুনিক ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন শক্তির আফগানিস্তান অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি সংঘাতের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। তবে একটি বিষয় ছিল প্রায় অভিন্ন—শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আফগান সমাজের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য: আফগানিস্তানের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি
উনিশ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, তখন ভারত ছিল তাদের সাম্রাজ্যিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একই সময়ে মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা ইতিহাসে ‘গ্রেট গেম’ নামে পরিচিত, আফগানিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশরা একাধিকবার আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব ঠেকানো। কিন্তু আফগানিস্তানের দুর্গম ভূপ্রকৃতি, স্থানীয় সামাজিক কাঠামো এবং শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্রিটিশদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কঠিন করে তোলে।
প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ১৮৪২ সালের শীতে কাবুল থেকে ব্রিটিশ ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পশ্চাদপসরণ সাম্রাজ্যটির সামরিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা আবারও আফগানিস্তানে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের মতো আফগানিস্তানকে সরাসরি উপনিবেশে পরিণত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
১৯১৯ সালের তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের পর আফগানিস্তান তার পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির সার্বভৌমত্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন: দীর্ঘ যুদ্ধে বিপর্যস্ত পরাশক্তি
১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল সে সময়ের অন্যতম বড় সামরিক হস্তক্ষেপ।
সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে ছিল বিশাল সামরিক বাহিনী, উন্নত অস্ত্র এবং বিপুল সামরিক সক্ষমতা। বিপরীতে আফগান প্রতিরোধকারীদের সামরিক সামর্থ্য ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু দুর্গম ভূখণ্ড ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের কারণে সোভিয়েত বাহিনী দ্রুত ও স্থায়ীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে সোভিয়েত বাহিনী এবং তাদের সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ধর্মীয় বিশ্বাস, স্থানীয় পরিচয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং দখলদারিত্বের বিরোধিতা প্রতিরোধকারীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
তবে এই যুদ্ধের মূল্য আফগান জনগণকেও ভয়াবহভাবে দিতে হয়। ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। লাখ লাখ আফগান প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
দীর্ঘ যুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপরও সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
যুক্তরাষ্ট্র: দুই দশকের যুদ্ধের পর প্রত্যাহার
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোট আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে।
অভিযানের প্রথম পর্যায়ে ইমারাতে ইসলামিয়ার শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। তবে একটি সরকারকে সামরিকভাবে উৎখাত করা এবং একটি জটিল দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যে একই বিষয় নয়, পরবর্তী দুই দশকের ঘটনাপ্রবাহে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ইমারাতে ইসলামিয়া ও তাদের যোদ্ধারা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল অর্থ ব্যয়, বড় সামরিক উপস্থিতি এবং আধুনিক সামরিক ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২০ সালে দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইমারাতে ইসলামিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে বিদেশি সেনাদের প্রত্যাহার শুরু হয়।
২০২১ সালের আগস্টে কাবুলে ইমারাতে ইসলামিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটি শেষ হয়।
কেন আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছে?
আফগানিস্তানের ইতিহাসকে শুধু সামরিক শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। দেশটির সামাজিক কাঠামো, ভূপ্রকৃতি, স্থানীয় নেতৃত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
আফগান প্রতিরোধকারীদের একটি বড় অংশের কাছে ঈমান ও ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণার উৎস। তারা বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াইকে নিজেদের ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে দেখেছে।
এর পাশাপাশি আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়, উপত্যকা ও বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চলও বড় ভূমিকা রেখেছে। এসব ভূপ্রকৃতি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং পুরো দেশকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তুলেছে।
স্থানীয় সামাজিক ও গোত্রীয় সম্পর্কও প্রতিরোধ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে রাজধানী বা বড় শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বনাম দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ
আফগানিস্তানের ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করে না।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছিল বিশাল উপনিবেশিক সামরিক শক্তি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী। আর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাগুলোর একটি। তারপরও তিনটি শক্তিই আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
তবে প্রতিটি যুদ্ধকে একই ছাঁচে দেখা ঠিক নয়। ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধ, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ—তিনটির কারণ, সময়কাল, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ফলাফল ছিল আলাদা।
তবু একটি সাধারণ শিক্ষা পাওয়া যায়: কোনো দেশের জনগণের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ইচ্ছা থাকলে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে তাদের রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন।
ইতিহাসের শিক্ষা
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, এরপর যুক্তরাষ্ট্র—আফগানিস্তানের ইতিহাসে একাধিক পরাশক্তির সামরিক উপস্থিতির সাক্ষী রয়েছে। সময় বদলেছে, অস্ত্র ও প্রযুক্তি বদলেছে, যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বিদেশি সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধ বারবার সামনে এসেছে।
আফগানিস্তানের ইতিহাস তাই শুধু যুদ্ধ ও পরাজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ভূরাজনীতি, জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধেরও ইতিহাস।
দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও দৃঢ় সামাজিক কাঠামোর পাশাপাশি আফগান জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দেশটিকে বহিরাগত শক্তির জন্য একটি কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এ কারণেই ইতিহাসে আফগানিস্তানকে বৃহৎ শক্তির দীর্ঘ সামরিক অভিযানের অন্যতম কঠিন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।
সূত্র: হুরিয়াত রেডিও